ঢাকা ভেঙে দুইটি সিটি হোক, বঙ্গবন্ধুনগর ও জাহাঙ্গীরনগর, মধ্যে থাকুক মুজিব স্কয়ার

591

নাঈমুল ইসলাম খান : ঢাকা অনেক প্রাচীন জনপদ। এই শহরে ১৪৫৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত একটি মসজিদ রয়েছে। জোয়াও দ্য ব্যারোস ঢাকাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান বিবেচনা করতেন এবং ১৫৫০ সালে তার তৈরি মানচিত্রে ঢাকার অবস্থান চিহ্নিত করে গেছেন। আকবরনামায় ঢাকা ছিলো একটি থানা, আইনি আকবরিতে পরগনা এবং ১৬১০ সালে ঢাকাকে করা হয় সুবাহ বাংলার রাজধানী এবং তৎকালীন সম্রাটের নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয় জাহাঙ্গীরনগর, তবে মানুষের মুখে ঢাকার নামটিই থেকে যায়। ১৮৪০-এর দশকে ঢাকায় সমৃদ্ধির নতুন যুগ শুরু হয় এবং এর কিছু আগেই ১৮২৯ সালে ঢাকা হয় বিভাগীয় সদর দফতর। ১৮৮৫ সালের মধ্যে বঙ্গ প্রদেশে কলকাতার পর ঢাকা হয়ে ওঠে বৃহত্তম জনপদ এবং ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে বঙ্গভঙ্গের ফলে ঢাকার গুরুত্ব নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের মাধ্যমে ঢাকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার পর রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত এবং ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন বিজয়ের মুখ দেখে। ঢাকা সেই বিজয়ের সোনালী কেন্দ্র।

ঢাকা শহর এখন সুবিস্তৃত এবং দ্রুত সমৃদ্ধ এবং আধুনিকতার ছোঁয়ায় গড়ে উঠেছে। বেশ কয়েক বছর হলো ঢাকা মহানগর এখন দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। শহরের ঐতিহ্যবাহী এবং পুরনো অংশটি ঢাকা দক্ষিণ হিসেবে নাম পেয়েছে। নতুন ও আধুনিক সম্প্রসারণশীল অংশটির নাম হচ্ছে ঢাকা উত্তর। পৃথিবীর অনেক দেশেই টুইন সিটির উদাহরণ আছে, তবে বাংলাদেশর রাজধানী ঢাকা টুইন নগরদ্বয়ের নামকরণ নিয়ে আমি একটি প্রস্তাব রাখতে চাই। ঢাকা দক্ষিণ সিটির নাম হোক জাহাঙ্গীরনগর এবং ঢাকা উত্তর সিটির নাম হোক বঙ্গবন্ধুনগর। এই দক্ষিণ সিটির নামকরণ জাহাঙ্গীরনগর করার পেছনে যুক্তি হচ্ছে এর গোড়াপত্তনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পাশাপাশি উত্তর সিটি এলাকার নাম বঙ্গবন্ধুনগর করার যৌক্তিকতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৪৭ উত্তর বাংলাদেশে সংগঠিত ভাষা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক সংগ্রাম এবং গণতন্ত্রের জন্য সকল আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশাল অবদানের বিপরীতে প্রবলভাবে যৌক্তিক। সংশ্লিষ্ট সকলে আমার নামকরণের প্রস্তাব দুইটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যে বিবেচনা করতে অনুরোধ করছি। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুনগর এবং জাহাঙ্গীরনগর এই দুই সিটি মিলে হবে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা।

রাজধানী ঢাকার দুই নগরে মোটামুটি বিভক্তি সীমানা এলাকায় কেন্দ্র হিসেবে আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে বিবেচনা করি। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭ মার্চ দেওয়া বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ এবং ২৬২ দিনে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের যবনিকায় ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে একই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ এই উদ্যানকে দিয়েছে এক অপরিবর্তনীয় ঐতিহাসিক মর্যাদা। এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সন্নিকটেই ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচিত হয়েছে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। তার আগে ১৯৪৮ সালে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা করার ঘোষণা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সাহসের সাথে এর প্রতিবাদ বিক্ষোভের সূচনা করেন। এভাবে বাঙালির সকল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ছাত্র আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখানেই দাঁড়িয়ে আছে স্বগৌরবে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জাতীয় চিত্রশিল্পী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কবরও এ এলাকায়।

আমরা যদি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে কেন্দ্র করে পূর্ব ও পশ্চিম এবং উত্তর ও দক্ষিণে এক মাইল জায়গা অন্তর্ভুক্ত করি তাহলে দেখা যাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা, ধর্মীয় ইত্যাদি শীর্ষ ও নেতৃস্থানীয় এবং প্রতিনিধিত্বশীল বহু প্রতিষ্ঠান যেমন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জাতীয় জাদুঘর, কেন্দ্রীয় পাঠাগার, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় চিত্রশালা, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, জাতীয় প্রেসক্লাব, পল্টন ময়দান, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, সচিবালয়, কার্জন হল, তিন নেতার মাজার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, বুয়েট, লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, জগন্নাথ হল, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, কাকরাইলের কেন্দ্রীয় গির্জা, শিখ উপাসানালয় গুরু দুয়ারা নানক শাহী, ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, হোটেল ইন্টার কন্টিনেল্টাল ইত্যাদি অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের কথা এখানে উল্লেখ করলাম।

এভাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের চারদিকে এক মাইল এলাকা অন্তর্ভুক্ত করলে একটি অসাধারণ বলয় পাওয়া যায় যেখানে পদে পদে পাওয়া যাবে বাঙালির গৌরবময় পরিচয়। আমরা এই এলাকাটি চিহ্নিত করে এর অন্তর্ভুক্ত স্থানগুলো একটি সুবিস্তৃত এলাকায় ছোট ছোট করে বর্ণনা লিখে দিলে সেটা সকলের জন্য হবে শিক্ষণীয় এবং গৌরবময় উপস্থাপন। এই এলাকার যথোপযুক্ত নাম হতে পারে মুজিব স্কয়ার। এর চেয়ে সুন্দর নাম আর হয় কি? এই মুজিব স্কয়ার আমরা ফুলে-সবুজে-আলোকে সাজাবো মনের মতো করে।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, দৈনিক আমাদের নতুন সময়