‘কংগ্রেসের পরিণতি যেন আওয়ামী লীগের না হয়’

402

স্টাফ রিপোর্টার:আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে বিশ্বরাজনীতিতে ঠাঁই পাওয়া মহাকাব্য যুগের যেসব নায়ক আমার হৃদয়ে আসন গ্রহণ করেছিলেন তার মধ্যে ভারতের গণতন্ত্রের মহান নেত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি আমার গভীর আবেগ, অনুভূতি

কৃতজ্ঞতাবোধ এবং তার ফ্যাশন, সাহস ও নেতৃত্বের মহিমার প্রতি গভীর মুগ্ধতা রয়েছে। আমার আজন্মলালিত রাজনীতির আদর্শের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর যদি কোনো বিশ্ববরেণ্য নেতার প্রতি আমার প্রবল আবেগ, অনুভূতি, পর্যবেক্ষণ থাকে তা শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি।

আমাদের গৌরবের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের জনগণ যেভাবে আশ্রয় দিয়েছেন, পাশে দাঁড়িয়েছেন, তার নেতৃত্বে ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। দারিদ্র্যপীড়িত বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর নানা সমস্যার মধ্যেও ইন্দিরা গান্ধী আমাদের আশ্রয়, অস্ত্র, ট্রেনিং সহায়তাই দেননি, এক কোটি শরণার্থীকে খাবারও দিয়েছিলেন।

আমাদের স্বাধীনতার প্রতি বিশ্বজনমত গড়তে পশ্চিমা দুনিয়া সফরও করেছেন। এমনকি পাকিস্তানি কারাগারে বঙ্গবন্ধুকে আটক রেখে ইয়াহিয়া খানের সামরিক আদালতে ফাঁসির আদেশ দিয়ে তা কার্যকর করে কবর দেওয়ার ব্যবস্থাও যখন চূড়ান্ত, তখন ইন্দিরা গান্ধী তার মুুুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক মহলের চাপ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিলেন।

ভারত আমার কাছে একটি প্রিয় দেশই নয়, পাশে থাকা আপন ও নিরাপদ বন্ধুর মতো। ভারতের সঙ্গে আমাদের ন্যায্য হিস্যা আদায়ে দেনদরবার, আলোচনা ও সমঝোতার চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেলেও তা বন্ধুসুলভ মনোভাবের হিসাব-নিকাশেই হওয়া উচিত। তেমনি একাত্তরেই মীমাংসা হয়ে গেছে যে,

আমাদের জনগণের ওপর ২৪ বছরের শোষণ-বঞ্চনা শেষে একাত্তরে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর পরিচালিত বর্বরতা, হত্যাকান্ড, ধর্ষণ এবং তার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমা না চেয়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে তাদের সংসদের ভিতরে-বাইরে বিভিন্ন সময়ের ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য প্রমাণ করে দেয় রাষ্ট্রীয়ভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও সেই বর্বরতার দাগ, সেই হত্যার বিভীষিকা এবং অমানবিক ধর্ষণের নিষ্ঠুরতা মুছে যায়নি।

পাকিস্তান আজন্ম শত্রুই থেকে গেছে। আর বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে নানা সরকারের সময় বন্ধুপ্রতিম ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন, কূটনৈতিক শীতলতা বা ছন্দপতন ঘটলেও ভারতবাসীর প্রতি আমাদের অস্তিত্বের স্মারক বা একাত্তরের রক্তে লেখা আবেগ, অনুভূতির বন্ধুত্ব সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়াও কখনো হালকা করতে পারেনি। ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর পরাজয়ে আমার কৈশোরের হৃদয় ব্যথিত হয়েছিল। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার খবর শুনে আমার তারুণ্যের হৃদয় আর্তনাদ করেছিল। আমার কোমল হৃদয় থেকে এই মহান নেত্রীর জন্য সেই রজনিতে অশ্রু ঝরেছিল।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পাঠ করে শান্তির দূত মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধায়, ভক্তিতে আমার হৃদয় প্রসারিত হয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী ব্রিটিশ ভারতের ধনাঢ্য ব্যারিস্টার মতিলাল নেহরুর পুত্র ভারতের আরেক কারানির্যাতিত প্রথম সারির স্বাধীনতা সংগ্রামী ও স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ’৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী পন্ডিত জওহরলাল নেহরুকে পাঠ করে তার শিক্ষা, রুচি, আভিজাত্য, পান্ডিত্য এবং উদার গণতান্ত্রিক চেহারা আমাকে অভিভূত করেছে।

কিন্তু তেজস্বী প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরা একাত্তর সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন তার পিতা নেহরু তার জায়গায় থাকলে সেই ভূমিকা নিতেন কিনা এ নিয়ে আমার সংশয় রয়েছে। এ পর্যবেক্ষণটি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামী রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি ভারতের প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের সঙ্গেও বিভিন্ন সময় আলাপচারিতায় শেয়ার করেছি। অনেকেই আমার সঙ্গে একমত হয়েছেন।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের এবারের লোকসভা নির্বাচন চলাকালে গেল মাসের শেষ দিকে কলকাতা ও দিল্লি সফরে গিয়েছিলাম। আমাদের স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রবীণ সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাশগুপ্তের সঙ্গে কলকাতায় কফি পান করতে করতে দীর্ঘ আড্ডা দিয়েছিলাম। বাংলাদেশে তার পূর্বপুরুষের স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। এ দেশের মানুষের জন্য তার আবেগ-অনুভূতি রয়েছে। একজন অসাম্প্রদায়িক, উদার, হৃদয়বান মানুষ হিসেবে আমার পর্যবেক্ষণে মনে হয়েছে, তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাম ফ্রন্টকে সমর্থন করেন।

দিল্লির ক্ষমতায় সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে জাতীয়তাবাদের স্লোগান তুলে উঠে আসা নরেন্দ্র মোদিকে আর দেখতে চান না। যদিও শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী থেকে কংগ্রেসের অনেক নেতার গভীর নৈকট্য পেয়েছেন।

দিল্লিতে একান্ত দীর্ঘ আড্ডায় আনন্দবাজারের আবাসিক সম্পাদক পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে একটি টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষালের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করেছি। সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত যে কথা আমাকে বলছিলেন, তা হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসছেন না।

কংগ্রেসের নেতৃত্বে আঞ্চলিক দলগুলো নিয়ে কোয়ালিশন সরকার হতে যাচ্ছে। তিনি পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসুরও একটি সতর্কবাণী স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। রাজনীতিতে সবার ঘর করা মমতাকে নাকি এই বলে সেদিন প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, বাংলায় বিজেপিকে এনে মমতা যে ভুল করেছেন একদিন তার খেসারত সবাইকে দিতেই হবে।

জয়ন্ত ঘোষাল তার পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে মোটা দাগে বলেছিলেন, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বেই বিজেপি জোট আবার ক্ষমতায় আসছে। কংগ্রেস শত আসন পেলেই তাদের ইজ্জত রক্ষা হবেÑ এমনটিই মনে করছে ভিতরে ভিতরে। এমনকি উত্তর প্রদেশে অখিলেশ-মায়াবতীর জোটে কংগ্রেসকে না নেওয়ার পরও কংগ্রেস জোট সেখানে প্রার্থী দিয়ে ভোট করতে গিয়ে বিজেপিকেই লাভবান করেছে। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের চেতনা লালন করা কেউ কেউ বলছিলেন, উত্তর প্রদেশে বিজেপির ভরাডুবি ঘটছে।

তারাও মোদি নয়, কোয়ালিশন সরকারের স্বপ্ন দেখে হিসাব-নিকাশ করছিলেন। আর জয়ন্ত ঘোষাল আরও বলছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যে খবর পাচ্ছেন তাতে মমতার দুর্গ থেকে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি অন্তত ১২টি আসনে জয় ছিনিয়ে নেবে।

দিল্লিতে তিন রাত থাকাকালে উবারে চড়তে গিয়ে সবকজন চালককে একটি প্রশ্নই করেছি, কে আসছেন ক্ষমতায়? সবাই একবাক্যে বলেছেন, মোদিই আসবেন ক্ষমতায়। কারণ, তার বিপরীতে কোনো নেতৃত্ব নেই। একজন উবারচালক এই বলে আমাকে চমকে দেন যে, সব আঞ্চলিক দলের এবং কংগ্রেস নেতারা মোদির বিরুদ্ধে ভোটের ময়দানে সমালোচনার তুফান তুলে কার্যত তারই প্রচারণা এগিয়ে দিচ্ছেন।

ঢাকায় বসে প্রথম যখন বুথ জরিপের ফলাফলে মোদির আর বিজেপির নামই উচ্চারিত হচ্ছিল, তখন দেখছিলাম অন্যরা সেটিকে আমলে নিচ্ছেন না। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচন কাভার করতে গিয়ে দেখেছি বুথ জরিপের ফলাফল সঠিক হয়েছিল। সেই নির্বাচনের এক বছর আগে দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের ১২ জন সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে সাত দিনের সফরে গিয়ে উপলব্ধি করেছি, এককালের কট্টর বিজেপি নেতা এল কে আদভানিকে হটিয়ে গুজরাটে টানা চার দফা বিজয়ী মুখ্যমন্ত্রী বহু বিতর্কের ঝড় মাথায় নিয়েও প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে উঠে আসছেন।

ঢাকায় ফিরে রিপোর্ট করেছিলাম, ‘মোদি ঝড়ে নিষ্প্রভ রাহুল’। আর নির্বাচন কাভার করতে গিয়ে দেখেছি, বিজেপিকে পেছনে ফেলে নরেন্দ্র মোদি নিজেকে ব্র্যান্ড করে পরিকল্পিত সংগঠিত শক্তিশালী প্রচারণা চালিয়ে নিজেকে সামনে নিয়ে এসেছেন। সেবার স্লোগান ছিল, ‘আব কি বার মোদিকা সরকার’ তার গুজরাট রাজনীতির ডান হাত অমিত শাহকে উত্তর প্রদেশের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

সেই নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি তার ক্যারিশমায় কংগ্রেস জোটের ১০ বছরের শাসনামলকে দুর্নীতির অভিযোগের তীরে যেমন ক্ষতবিক্ষত করছেন, তেমনি গান্ধী পরিবারের নেতৃত্বের মুখ সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধীকে তীব্র শক্তি নিয়ে আঘাত করছেন।