শেখ হাসিনা এখন রাজাকার দ্বারা পরিবেষ্টিত: আবদুল গাফফার

3725

ঢাকা: সম্প্রতি লন্ডন থেকে বাংলাদেশে এসেছেন একুশের অমর গানের রচিয়তা ও প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী। অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনে।

প্রাচীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, বাংলাদেশের রাজনীতি, তার জীবন-কর্ম এবং অমর একুশের গান নিয়ে তিনি বাংলানিউজের মুখোমুখি হয়েছিলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাংলানিউজের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট দীপন নন্দী। পাঠকদের জন্য দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ প্রকাশিত হলো শেষ পর্ব।

বাংলানিউজ: গত ১৫ ডিসেম্বর যখন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করেছিল, তখনই আপনি জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে ওই তালিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। যা পরবর্তীতে সঠিক হয়। কীভাবে আপনি এই ভবিষ্যতবাণী করলেন? আপনার কাছে কী কোনো তথ্য ছিল?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: এটা বলতে পারেন সাংবাদিক দৃষ্টিভঙ্গি। আমি ৫০ বছর ধরে সাংবাদিকতা করি। জ্ঞানবৃদ্ধি পায়নি, কিন্তু অভিজ্ঞতা বেড়েছে। সে অভিজ্ঞতার জের ধরেই বলতে পারি, রাজাকারের তালিকা কোনো রাজাকারই করেছে।

বাংলানিউজ: আপনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের একই অনুষ্ঠানে বলেছিলেন- ‘শেখ হাসিনা রাজাকার দ্বারা পরিবেশিষ্ট’। এ মন্তব্যের বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: যেহেতু আমি বাংলাদেশে থাকি না, সেহেতু খুব সহজেই বলতে পারি ‘শেখ হাসিনা এখন রাজাকার দ্বারা পরিবেষ্টিত’। এটা বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সময়ে আমি লন্ডনে ছিলাম। ফিরে এসে দেখি বঙ্গবন্ধুর যিনি মুখ্যসচিব হয়েছেন, তিনি পাকিস্তান রাজাকার বাহিনীর স্কোয়াড লিডার ছিলেন। আরেকবার দেখি কর্নেল ফারুককে বঙ্গবন্ধু তার পারসোনাল গার্ডদের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। সরদার আলীকে তিনি গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধানের দায়িত্ব দেন। যে কিনা পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনীর পূর্ব পাকিস্তান অংশের প্রধান ছিলেন। জিয়াউর রহমানকেও তিনি পোস্ট দেন। যে কিনা পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সেকেন্ড গ্রুপের লিডার ছিলেন।

বাংলানিউজ: রাজনীতি তো অনেক আলাপ হলো। এবার একটু ভিন্ন বিষয়ে যাই। সেটি হলো আপনার অমর গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো… আমি কি ভুলিতে পারি’। যদিও বহুবার বলেছেন, তারপরও আরেকবার যদি গানটার সৃষ্টির গল্প বলতেন।

আবদুল গাফফার চৌধুরী: বাংলা একাডেমি থেকে ‘একটি গানের জন্মকথা’ নামে বই রয়েছে। সেখানে বিস্তারিত লিখেছি। বারবার বলাটা কষ্টকর। ৬০ বছরে ৬০০ বার বলেছি। রিপিট করতে করতে অনেক ভুল তথ্যও ঢুকে যাচ্ছে।

বাংলানিউজ: তারপরও যদি একটু বলতেন। যতদূর জানি, প্রথমে সেটি কবিতা ছিল।

আবদুল গাফফার চৌধুরী: ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার উপরে পুলিশ গুলি ছোঁড়ার পর ঢাকা মেডিকেলের আউটডোরে একটি লাশ দেখতে পাই। সেটি ছিল শহিদ রফিকের লাশ। সেটা দেখি আমি একটি কবিতা লিখি। সেটা আমাদের বর্তমান জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের ছোট ভাই রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী আতিকুল ইসলামের চোখে পড়ে। কবিতাটা তিনি নিয়ে যান আবদুল লতিফের কাছে। তিনিই প্রথমে সুর দেন। ১৯৫৩ সালে শহীদ আলতাফ মাহমুদ গানটির আবার সুর দেন। সেই সুরটিই এখন প্রচলিত।

সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব
** পুনর্গঠিত না হলে হাসিনার পর আ’লীগের অস্তিত্ব থাকবে না

বাংলানিউজ: আপনি প্রতিদিনই কলাম লেখেন। কীভাবে লেখেন?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: এটা সত্য যে আমি প্রতিদিনই লিখি। প্রতিদিন সকালে লিখি। এক সময় বাবার সঙ্গে ফজরের নামাজ পড়তাম। এখন নামাজ পড়ি না। কিন্তু অভ্যাসটা রয়ে গেছে। অভ্যাসে সকালে উঠে কিছু কাজকর্ম করার আগে লেখা শুরু করি। শেষ করে অন্য কাজ করি। সকাল ১০টা-১১টার মধ্যে লেখা শেষ হলে সেটি পাঠিয়ে দিয়ে অন্য কাজ শুরু করি।

বাংলানিউজ: আপনি জীবনের শুরুতে গল্প-কবিতা লিখতেন। সেগুলো জনপ্রিয়তাও পায়। কিন্তু পরবর্তীতে সেটি কেন ধরে রাখলেন না?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: সাহিত্যিক আবদুল গাফফার চৌধুরী মারা গেছেন- বলতে পারো।

বাংলানিউজ: এর কারণ?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: অর্থনৈতিক কারণ। কলেজ থেকেই নিজের খরচ নিজেই চালাতাম। বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের পারিবারিক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে। তখন ঢাকায় চলে আসি। ‘ইনসাফ’ নামে একটি পত্রিকায় ৭৫ টাকা বেতনে নাইট শিফটের কাজ নিই। এরপর ‘সংবাদ’, ‘মিল্লাত’-সব কাগজে চাকরি করেছি। এর ফাঁকে ফাঁকে গল্প-কবিতা লিখেছি। কিন্তু বিবাহিত জীবনে গিয়ে দেখলাম, গল্প-কবিতা লিখে কিছু হবে না।

বাংলানিউজ: আপনার প্রথম বইয়ের বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: ১৯৫৯ সালে আমার প্রথম বই ‘কৃষ্ণপক্ষ’। বইটি ইস্টবেঙ্গল পাবলিকেশন থেকে প্রকাশ পেয়েছিল। সুরেশ বাবু ছিলেন প্রকাশক। ১০০ টাকা নিতে ১০০ বার যেতে হয়েছিল।

বাংলানিউজ: সাংবাদিকতা পেশায় থেকেও অনেকে সাহিত্য ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু আপনি সেটা করেননি, এ নিয়ে আপনার কোনো আক্ষেপ আছে কী?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: আক্ষেপ আছে। আমার সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছা ছিল না। হওয়ার কথা ছিল সাহিত্যিক।

বাংলানিউজ: ১৯৭৪ সালে কলকাতা হয়ে লন্ডনে চলে যান। এরপর কেন দেশে কেন ফিরে আসলেন না?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: প্রথমত আমার স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন। তার সব ওষুধ বাংলাদেশে পাওয়া যেত না। বঙ্গবন্ধুই আমাকে পাঠিয়েছিলেন, টাকাও দিয়েছিলেন। এরপর আর দেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি। পরে শেখ হাসিনার সময় আমায় দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এজন্য অনেকেই বলেন, বঙ্গবন্ধু চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছিলেন আর শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে এনে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

বাংলানিউজ: আপনি ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলজেরিয়ায় জোট নিরপেক্ষ (ন্যাম) সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: ভয় ছিলো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। কারণ, ওটা অনেক বড় সম্মেলন ছিল। মিশরের আনোয়ার সাদাত, সৌদি আরবের কিং ফয়সাল, লিবিয়ার গাদ্দাফি, কিউবার ফিদেল কাস্ট্রোসহ ৭৩ দেশের প্রতিনিধি এসেছিলেন।বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল, কিন্তু দেশ চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল না। মাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কথা বলতে পারবেন কী-না সে বিষয়ে সন্দেহ ছিলো। কিন্তু সেই সন্দেহ তিনি কাটিয়ে এসেছিলেন। এটাই তার বড় বিশেষত্ব।

ওই সম্মেলনে প্রথম বর্ণানুক্রমিকভাবে আফগানিস্তানের প্রতিনিধির কথা বলার কথা ছিল। কিন্তু তিনি বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা শুনতে চাই। এরপর বঙ্গবন্ধু বক্তৃত করেন। যা শুনে ফিদেল কাস্ট্রো ছুটে এসে বঙ্গবন্ধুকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, আপনাকে দেখেছি। আমার আর হিমালয় দেখার দরকার নেই’। সৌদি আরবের কিং ফয়সাল যে কিনা একাত্তরে পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়েছিল গণহত্যার জন্য। তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে এসে বারবার বলেন, ‘আমি লজ্জ্বিত, আমি লজ্জ্বিত। বঙ্গবন্ধু যে বড় লিডার, সেটা ওই সম্মেলনেই প্রমাণ হয়ে যায়।’

বাংলানিউজ: আর কোনো স্মৃতি?

আবদুল গাফফার চৌধুরী: ওই (ন্যাম) সম্মেলনে একবার গণ্ডগোল লেগে যায়। আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলায় তিউনিয়াশার হাবিব বুর্গিবা চটে যান। তিনি বলেন, ‘আমরা নিরপেক্ষ ঠিক আছে। কিন্তু আমেরিকাও একটা পক্ষ। এসব নিয়ে কথা কাটাকাটির এখন পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমরা দুই পক্ষ নয়। একটা পক্ষ। সেটা হলো আমরা সব সর্বহারার দল।’ এরপর সবাই হাততালি দিয়ে তাকে সমর্থন দেন।

আরও একটা স্মৃতি আছে। আলজেরিয়ার বিখ্যাত মসজিদ গ্র্যান্ড মসজিদে বঙ্গবন্ধু, আনোয়ার সাদাত, কিং ফয়সল দলবেধে নামাজ পড়তে যেতেন। আর কোনো মুসলিম রাষ্ট্রনায়ক যেতেন না। তখন একদিন আলজেরিয়ার এক সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি তো সেক্যুলার, তাহলে নামাজ পড়েন কেন?’ এর জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ইন মাই পারসোনাল লাইফ, আই এম এ ট্রু মুসলিম। বাট ইন মাই পলিটিক্যাল লাইফ, আই এম সেক্যুলার।’ এ বক্তব্য যে সময় আলজেরিয়ায় আলোড়ন তোলে।