বুকে ছিদ্র করে পাইপ দিয়ে বাতাস বের করতে হবে; বাবার মৃত্যুর করুণ বর্ণনা

18

বেড়েই চলেছে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে এই রোগ।

দেশের অন্যান্য জেলার মতো চট্টগ্রামেও করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছেই। এমন অবস্থায় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠে আসছে হৃদয়বিদারক নানা ঘটনা।

সম্প্রতি শ্বাসকষ্টে বাবার মৃত্যু নিয়ে হৃদয়বিদারক এক স্ট্যাটাস দিয়েছেন চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ী।

তিনি লিখেছেন, বাবাকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরতে হল, কেউ তাকে ভর্তি নেয়নি। শেষ পর্যন্ত ঠাঁই হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে। কিন্তু তাকে আর বাঁচানো যায়নি।
পাঠকদের জন্য স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হল।

“বাবার বয়স ৮২ বছর, দীর্ঘদিন ব্রঙ্কাইটিস এবং প্রষ্টেটের সমস্যায় ভুগছেন। ২৭ রমজান সেহরি শেষ করতে না করতেই বুকে ব্যথা অনুভব করেন সাথে শ্বাসকষ্ট-কাশি, কাশির সাথে হালকা র’ক্ত দেখা যায় এবং প্রচুর ঘামতে থাকেন। বর্তমান প’রিস্থিতিতে মেডিকেল এবং প্রাইভেট

হাসপাতালের বিমাতা শুলভ আচরণের কথা ভাবতে ভাবতেই ঘণ্টাখানেক কেটে যায়। বাবার অবস্থার কোন পরিবর্তন না দেখে কপালে যা থাকে হবে মেনে নিয়ে বাবাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম এবং দ্রুতগতীতে নগরীর পার্কভিউ হাসপাতালের ইমার্জেনসিতে ঢুকলাম।

এরমধ্যে ছোট বোনের হাজব্যান্ড এসে উপস্থিত হলো, কর্তব্যরত ডাক্তার বুকের এক্সরে এবং ইসিজি করালেন, রিপোর্ট দেখে বললেন বাবাকে দ্রুত আইসিইউ’তে রাখতে হবে।

আমি সময় নষ্ট না করে ব্যবস্থা নিতে বললাম কিন্তু কতৃর্পক্ষ তাদের আইসিইউ’তে রাখার অপারগতা জানালেন কারণ। দু’দিন আগে নাকি ওনাদের হাসপাতালে একজন রোগীর কোভিড পজেটিভ আসে। সর্বোচ্চ অনুরোধ করার পর জানতে চাইলাম বাবার রিপোর্টে কোভিডের কোনো আশং’ঙ্কা আছে কিনা?

ডাক্তার জানালেন তেমন কোন আশংঙ্কা নেই। বললাম দয়া করে আমাকে এটুকু বলেন যে বাবার বতর্মান যা অবস্থা তাতে অন্য কোন হাসপাতাল এডমিট করবে কিনা? ওনি জানালেন এডমিট না করার কোন কারণ নেই, আমি যেন ম্যাক্স অথবা ন্যাশনালে নিয়ে যাই।

কালক্ষেপণ না করে ম্যাক্সের দিকে ছুটলাম। ম্যাক্সের ইমার্জেন্সিতে রিপোর্ট দেখালাম। ওনারা বললেন, আইসিইউ খালি আছে তবে একটু সময় দিতে হবে।

ফাইল আইসিইউ’তে পাঠানো হলো, আমার সামনেই কর্তব্যরত ডাক্তার কয়েকজনকে ফোন করলেন এবং জানালেন আইসিইউ’র ডাক্তাররা ছুটিতে আছেন তাই অ্যাডমিট করতে পারবেন না। বুঝলাম রিকোয়েস্ট করেও কাজ হবে না।

সময় নষ্ট না করে ন্যাশনালে ঢুকলাম। ঢুকেই নানা রকমের প্রশ্নের সম্মুক্ষীন হলাম। যেমন- পার্কভিউ ভর্তি করালো না কেন? ম্যাক্স কি বললো?

মাথা ঠাণ্ডা রেখে উত্তর দিলাম এবং অনুরোধ করে বললাম যে বাবার অবস্থা খুবই খারাপ এবং ওনার কোভিডের কোনো সমস্যা নেই।

রিপোর্টগুলো ভালো মতো চেক করে ইমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্ট আইসিইউ’তে ফোন করে জানালেন এবং তড়িৎ ব্যবস্থা নিতে বলে আমাকে ফাইল নিয়ে কাউন্টারে পাঠালেন।

এরপর কাউন্টারে কর্মরত ব্যক্তি প্রথমে যা বললেন তা হলো, একদিনে কুড়ি হাজার বা তার অধিক বিল আসতে পারে রাজি আছি কিনা! আমি শুধু বললাম তাড়াতাড়ি করেন প্লিজ। বাবাকে আইসিইউ’তে ঢুকানো হলো।

স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে না ফেলতেই আইসিইউ থেকে আমার ডাক পড়লো, ভেতরে গিয়ে দেখলাম ডাক্তার সাহেব রাগে গজগজ করছেন এবং একজন আরেক জনকে বলছেন ইমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টের কেমন আক্কল!

এই ধরনের রোগীকে আইসিইউ’তে পাঠালেন!আর আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনার বাবার কি সমস্যা আপনি জানেন? বললাম না, তবে মনে হয় কোভিড-১৯ না।

উত্তর শুনে ডাক্তার মশাই রেগে গিয়ে বললেন, আপনি কি ডাক্তার যে বললেন কোভিড না? ওনি খুবই বিপদজনক ওনাকে কোনভাবেই আমাদের আইসিইউ’তে রাখা যাবে না।

দয়া করে ওনাকে এখনি নিয়ে যান। বললাম, ইমার্জেন্সি থেকে যে বললো আইসিইউ’তে রাখতে সমস্যা নেই, কোন উত্তর না দিয়ে ডাক্তাররা বেরিয়ে গেলেন। ফাইল নিতে নিতে বাবার দিকে তাকালাম, বাবার নিশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে নিজের অজান্তেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিলো।

আমার এক বন্ধু প্রবালকে (কার্ডিওলজিস্ট, আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতাল) পেলাম এবং বিস্তারিত জানার পর সে বললো কোন প্রাইভেটে ট্রাই না করে যেন দ্রুত মেডিকেলে চলে যায়।মেডিকেলে গিয়ে দেখি ইমার্জেন্সিতে করোনা উপসর্গ নিয়ে আসা অনেক রোগীর ভিড়, সাধারণ রোগীসহ সবাইকে এক জায়গায় প্রাইমারী ট্রিটমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। এরমাঝে, বাবাকে যতদূর সম্ভব নিরাপদ দূরত্বে রেখে ফাইল নিয়ে হাজির হলাম।

সব শুনে এবং রিপোর্ট দেখে বললেন বুকের এক্সরে আর ইসিজি করাতে হবে। আমি বললাম স্যার এগুলোতো আমার করা আছে। বললেন কবে করিয়েছেন?

বললাম এইতো ঘণ্টাখানেক আগে, কথা শুনে রিপোর্ট গুলো আমার দিকে ছুড়ে দিয়ে বললেন, যা বললাম তাই করেন।অনেক কষ্টে একটা হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করে বাবাকে নিয়ে এক্স’রে করাতে ছুটলাম। গিয়ে দেখি লম্বা লাইন।