আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে সখ্য রেখে নিয়ন্ত্রণ করত অপরাধ জগত “পাগলা মিজান”

568

এলাকায় পাগলা মিজান নামে পরিচিত। পুরো নাম হাবিবুর রহমান মিজান। তিনি ঢাকা উত্তর সিটির ৩২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। একসময় ফ্রিডম পার্টি করতেন। তারপর নাম লেখান আওয়ামী লীগে।

মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার পর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকায় তিনি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। তার ভয়ে তটস্থ থাকে এলাকার বাসিন্দারা।

কেউ কেউ তাকে মা দকের গডফাদার বলেন। অ’পরাধ জগতের অলরাউন্ডার হিসাবে খ্যাতি রয়েছে। অপরাধের ষোলকলাই পূর্ণ করেছেন এই কাউন্সিলর। জমি দখল, ছিনতাই, ক্যাসিনো বানিজ্য, মাদ ক ব্যবসা, চাঁ দাবাজি, টেন্ডারবাজি এমনকি খু’নের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে পুলিশ মামলা নিত না।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হ’ত্যার উদ্দেশ্যে তার বাড়িতে হামলায়ও জড়িত ছিলেন মিজান। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় মামলা হয়েছিল। এছাড়াও ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, আদাবর, শেরেবাংলা নগর ও সাভার থানায় তার নামে একাধিক মামলা রয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার সঙ্গে সখ্যতা রেখে নিয়ন্ত্রণ করতেন অপরাধ জগত।

নিজে  ক্ষমতাসীন দলের নেতা তাই তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সম্প্রতি ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর ক্লাব ব্যবসার আড়ালে ক্যাসিনো বাণিজ্যতেও তার নাম উঠে আসে। এরপর থেকে তিনি গাঁঢাকা দেন। পালিয়ে বিদেশে চলে যান। ভেবেছিলেন অভিযানে কিছুটা স্থবিরতা এসেছে। তাই দেশে চলে আসেন। 

কিন্তু পার পাননি এই কাউন্সিলর। দেশে আসার পর বুঝতে পারেন র‌্যাব তাকে খুঁজছে। তাই ফের বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু বিমানবন্দরে র‌্যাবের কড়া নিরাপত্তা থাকায় সেটিও সম্ভব হয়নি। পরে অ বৈধভাবে মৌলভীবাজার জেলার একটি সীমান্ত দিয়ে পাশ্ববর্তী দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। এজন্য গত কয়েকদিন ধরে শ্রীমঙ্গলে অবস্থান করছিলেন। গতকাল র‌্যাবের একটি টিম তাকে সেখান থেকেই গ্রেপ্তার করেছে।

র‌্যাব জানিয়েছে,সাম্প্রতিক শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসাবেই পাগলা মিজানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর র‌্যাব তাকে নিয়ে তার লালমাটিয়ার অফিসে ও মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেবের বাসায় অভিযান চালিয়েছে। অভিযানের নেতৃত্ব দেন র‌্যাব সদরদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। এসময় তার অফিসে কিছু না পাওয়া গেলেও বাসা থেকে ৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকার বিভিন্ন ব্যাংকের চেক, এক কোটি টাকার এফডিআর উদ্ধার করা হয়েছে। আর শ্রীমঙ্গল থেকে গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে  নগদ দুই লাখ টাকা, একটি পিস্ত ল ও চার রাউন্ড গু লি উদ্ধার করা হয়। 

অভিযানের পর ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, বৃহস্পতিবার তার চেক দিয়ে ৬৮ লাখ টাকা তোলা হয়েছে বলে তথ্য আছে। এছাড়াও তিনি জানিয়েছেন, কাউন্সিলর মিজানের আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় দুটি বাড়ি ও ১টি দামি গাড়ি আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান একসময় সিটি করপোরেশনের ম্যানহলের ঢাকনা চুরি করে বিক্রি করতেন। ওই সময় প্রতি রাতেই সিটি করপোরেশনের ঢাকনা চুরির খবর পাওয়া যেত। পাশাপাশি ছিনতাইকারী দলেও নাম লেখান।

তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, আদাবর, শ্যামলী এলাকায় প্রায়ই ছিনতাই করতে গিয়ে ধরা খেতেন। আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশের পরেই মিজান ফুলে ফেঁপে উঠা শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে তিনি সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। কাউন্সিলর হিসাবেও বেপরোয়া ছিলেন মিজান। এক সাবেক মন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে এলাকায় নানা অ পকর্ম করে বেড়াতেন।

চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বাড়ি দখল, জমি দখল করেছেন। বিশেষ করে দখলবাণিজ্যে তিনি টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছেন। এক দশকে তিনি মোহাম্মদপুর এলাকার কাটাসূর ও বেড়িবাঁধ এলাকায়  হাউজিং প্রকল্প দখল, কমিউনিটি সেন্টার দখল, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের তিন বিঘা জমি দখল, জেনেভা ক্যাম্পের তিনটি বাড়ি দখলসহ আরও একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট দখল করে নিয়েছেন মিজান।

অনুসন্ধানে জানাগেছে, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, আদাবর, শেওড়া, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, সাভারে নামে বেনামে রয়েছে তার একাধিক জমি। মোহাম্মদপুর ও আশেপাশের এলাকার প্রতিটা কাঁচাবাজার থেকে প্রতিদিন চাঁদা নেন। এমনকি তার নেতৃত্বেই লালমাটিয়ায় কার হাট বসে। সেখান থেকেও চাঁদাবাজি করেন। শ্যামলী ক্লাবের জমি দখল করে কাঁচাবাজার করেছেন। অভিযোগ আছে, টেন্ডারবাজিতে আধিপত্য রয়েছে মিজানের।

একসময় ঢাকা ওয়াসা, গণপূর্ত অদিদপ্তর, শিক্ষাভবন, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। অ স্ত্রের ভয় দেখিয়ে তার বাহিনী ছিনিয়ে নিয়ে যেত টেন্ডার। সূত্র বলছে, মিজান মোহাম্মদপুরের বিহারী ক্যাম্পে অ বৈধভাবে ভবন-জমি দখল, অ বৈধ বিদ্যুত সংযোগ, গ্যাস সংযোগ দিয়ে মাসে মাসে দশ লাখ টাকার চাঁদাবাজি করতেন। শ্যামলী মাঠের জমি দখল করে অ বৈধ তিন শতাধিক দোকান তৈরি করে মাসে মাসে লাখ লাখ টাকা ভাড়া নিতেন।

পুলিশ ও র‌্যাবের তথ্যমতে, বিহারি ক্যাম্প ও মোহাম্মদপুর এলাকার মাদকের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক হাবিবুর রহমান মিজান।

সূত্র জানায়, ১৯৭৪ সালে মিজান ঝালকাঠির নলছিটি থেকে ঢাকায় আসেন। পরে মিরপুরের একটি হোটেলে কাজ নেন। এরপর তিনি চাঁ দাবাজি ছিন তাই শুরু করেন। পঁচাত্তরের দিকে পেশাদার ছিন তাইকারী হয়ে যান। ওই বছরই খামার বাড়ি এলাকায় ছি নতাই করতে গিয়ে ধরা পড়েন মিজান। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে লালমাটিয়া মসজিদের পুকুরে গিয়ে ঝাঁপ দেন। পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রায় চার তেকে পাঁচ ঘন্টা পুকুরের মধ্যে ছিলেন। এরপরে তিনি পুকুর থেকে কাপড় ছাড়াই ন্যাংটা হয়ে উঠে আসেন। তার এমন কান্ডে পুলিশ তাকে পাগল বলে আখ্যায়িত করে। এরপর থেকে সে পাগলা মিজান নামেই পরিচিত।

১৯৯৬ সালে যুবলীগ নেতা ইউনুস হ’ত্যা মামলার অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানায় মিজানের বিরুদ্ধে একটি মামলা এবং ২০১৬ সালে সাভার থানায় ডাবল মার্ডারে অভিযোগে তার নামে মামলা রয়েছে। শরীফ হ’ত্যা মামলায় মিজানের নাম উঠে আসে। কিন্তু তৎকালীন মোহাম্মদপুর থানার ওসি তার নামে মামলা নেননি।  যুব সংহতির দিদার হ’ত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামি ছিলেন মিজান।

মিজানের ভাই মোস্তফাও ভয়ঙ্কর স’ন্ত্রাসী ছিলেন। ফ্রিডম পার্টির নেতার পাশপাশি তিনি নানা অপকর্ম করে বেড়াতেন। অ স্ত্র উঁচিয়ে স’ন্ত্রাসী কর্মকান্ড করতেন। ১৯৮৯ সালের এপ্রিল মাসে শেখ হাসিনাকে হ’ত্যার উদ্দেশ্যে ধানমন্ডি ৩২ এ বঙ্গবন্ধুর বাসায় হামলা করা হয়। ওই হামলার মিজান ও তার ভাই ফ্রিডম পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোস্তফা জড়িত ছিলেন।

পরবর্তীতে লালমাটিয়া এলাকায় স’ন্ত্রাসীদের হাতে মোস্তফা খু’ন হন। ওই হামলার ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছিলো। মামলার তদন্ত করে ১৯৯৭ সালে সিআইডি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ১৬ জনকে আসামী করে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছিলো। চার্জশিটে পাগলা মিজানকে হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসাবে তুলে ধরা হয়।

২০১৬ সালে সাভারের আমিন বাজারের তুরাগের কাছে সিলিকন সিটির জমি দখল করতে চেয়েছিলেন হাবিবুর রহমান মিজান ও তার সহযোগীরা। জমি দখল করতে ব্যর্থ হয়ে মিজান সিলিকন সিটি কর্তৃপক্ষের কাছে ৭০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। কিন্তু সিলিকন সিটি সেই টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে মিজান ও তার বাহিনী সিলিকন সিটির লোকজনের ওপর গুলি ও হাতবো’মা ছুঁড়ে হামলা চালায়। ওইদিন থেকেই নিখোঁজ হন সিলিকন সিটির এক কর্মী। মিজান ও তার সহযোগীরা তাকে মেরে নদীতে ফেলে দেয়। ওই ঘটনার দুই দিন পর নিখোঁজ জুয়েলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় মিজান ও তার সহযোগীদের আসামি করে একটি হ’ত্যা মামলা দায়ের হয়।

অভিযোগ আছে ২০১৪ সালে হাবিবুর রহমান মিজানের নেতৃত্বে স্থানীয় যুবলীগ নেতারা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদপুর এলাকায় ৬৫ বছরের বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আহমেদ পাইন ও তার স্ত্রী মরিয়ম বেগমকে প্রকাশ্য জুতাপেটা করান।

র‌্যাবসূত্র জানিয়েছে, গত সোমবার থেকে কাউন্সিলর মিজান লাপাত্তা। ওইদিন তিনি বাসে করে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের এক আত্মীয়ের বাসায় যান। পরিকল্পনা ছিল সেখান থেকেই তিনি বিদেশে পালিয়ে যাবেন। এদিকে, গতকাল মিজানের মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেবের বাসায় গিয়ে কথা হয় তার স্ত্রী মনি রহমানের সঙ্গে। তিনি তার স্বামীর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার স্বামী ষড়যন্ত্রের শিকার। সে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে।

তিন বারের নির্বাচিত কাউন্সিলরও। সামনে সিটি করপোরেশনের নির্বাচন তাই একটি মহল তার ভোট ব্যাংক ধ্বংস করার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। পারিবারিক সূত্রে জানাগেছে, হাবিবুর রহমান মিজানের স্ত্রী ছাড়াও তিন ছেলে আছে। ইউছুব হাবিব মামুন বাবার সঙ্গেই কাজ করে। মেঝ ছেলে মিশু অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ছিল। এখন দেশেই থাকে। আর ছোট ছেলে কিষাণ অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মনি রহমান আরও বলেন, মঙ্গলবার র‌্যাবের বড় একটি টিম বাসায় এসে অভিযান চালিয়েছে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত